অফিসে দিনের অনেকটা সময় যায় ইমেইলে। কিছু ইমেইল সহজ, দুই লাইনে শেষ। কিন্তু কিছু ইমেইল লিখতে বসলে আটকে যেতে হয়। বসকে দেরির কথা জানানো, ক্লায়েন্টকে "না" বলা, সহকর্মীকে তৃতীয়বার তাগাদা দেওয়া। কী লিখলে ভদ্র শোনাবে অথচ কথাটাও পরিষ্কার থাকবে, তা ভাবতে ভাবতে আধা ঘণ্টা চলে যায়। ইংরেজিতে লিখতে হলে সময় আরও বেশি লাগে।
এই ধরনের ইমেইলের খসড়া তৈরিতে AI খুব কাজের। তবে তাকে শুধু "একটা ইমেইল লিখে দাও" বললে যা আসে, তা লম্বা, আনুষ্ঠানিক আর যেকোনো অফিসের জন্য চলে। পাঁচটি নির্দেশনা দিলে খসড়া অনেক কাছাকাছি আসে।
উদাহরণ: একটি দেরির খবর
ধরুন, ফারহান নামে একজন কাল্পনিক কর্মী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁর একটি প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু অন্য বিভাগ থেকে একটি তথ্য আসতে দেরি হওয়ায় তিনি রবিবারের আগে দিতে পারবেন না। এই কথাটি তাঁর ব্যবস্থাপককে ইমেইলে জানাতে হবে।
এই ইমেইল ধরে পাঁচটি নির্দেশনা দেখি।
নির্দেশনা ১: কাকে লিখছেন
একই কথা বসকে, সহকর্মীকে আর ক্লায়েন্টকে এক ভাষায় লেখা হয় না। তাই প্রথমেই বলুন পাঠক কে এবং তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন।
আমি আমার সরাসরি ব্যবস্থাপককে লিখছি। আমাদের সম্পর্ক পেশাদার কিন্তু আন্তরিক। তিনি ব্যস্ত মানুষ, ছোট ইমেইল পছন্দ করেন।
এই তিন লাইন থেকে AI বুঝে নেয় ভাষা কতটা আনুষ্ঠানিক হবে এবং লেখা কত বড় হবে। পাঠকের নাম দেওয়ার দরকার নেই, "ব্যবস্থাপক" বললেই চলে।
নির্দেশনা ২: কী জানাতে চান
মূল বার্তাটি এক-দুই লাইনে লিখুন। এখানে সব তথ্য আপনাকেই দিতে হবে, কারণ AI আপনার অফিসের কিছু জানে না।
জানাতে চাই: প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবারের বদলে রবিবার জমা দেব। কারণ: হিসাব বিভাগ থেকে একটি প্রয়োজনীয় তথ্য এখনো আসেনি, তাঁরা শুক্রবারের মধ্যে দেবেন বলেছেন। প্রতিবেদনের বাকি অংশ তৈরি আছে।
তথ্য যত নির্দিষ্ট, ইমেইল তত ভালো। "কিছু সমস্যার কারণে দেরি হবে" লিখলে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে। কোন সমস্যা, কত দিনের দেরি, এখন কী অবস্থা, এগুলো বলে দিলে প্রশ্নের সুযোগ থাকে না।
নির্দেশনা ৩: পাঠকের কাছে কী চান
প্রতিটি ইমেইলের একটি উদ্দেশ্য থাকে। পড়ার পর পাঠক কী করবেন? অনুমোদন দেবেন, তথ্য দেবেন, নাকি শুধু জানবেন? এটি বলে না দিলে AI শেষে একটি অস্পষ্ট লাইন লিখে দেয়।
আমি চাই তিনি নতুন তারিখে সম্মতি দিন। আর যদি বৃহস্পতিবারেই কোনো অংশ দরকার হয়, তাহলে যেন জানান, আমি তৈরি অংশটুকু আগে পাঠিয়ে দিতে পারি।
দ্বিতীয় লাইনটি লক্ষ করুন। শুধু সমস্যা জানানো নয়, একটি বিকল্পও দেওয়া হলো। এতে পাঠক বোঝেন আপনি দায়িত্ব নিয়ে ভাবছেন।
নির্দেশনা ৪: সুর ও দৈর্ঘ্য
সুর মানে লেখাটি পড়ে কেমন লাগবে। ভদ্র, সরাসরি, আন্তরিক, দৃঢ়। দৈর্ঘ্যও বলে দিন, নইলে AI স্বভাবগতভাবে লম্বা লেখে।
সুর: ভদ্র ও সরাসরি। অতিরিক্ত ক্ষমা চাওয়া বা অজুহাতের মতো শোনাবে না। দৈর্ঘ্য: পাঁচ থেকে ছয় লাইন। বাংলায় লেখো।
"অতিরিক্ত ক্ষমা চাওয়া নয়" বলে দেওয়া দরকার। AI-এর খসড়ায় প্রায়ই তিনবার দুঃখ প্রকাশ থাকে, যা পড়তে অস্বস্তিকর। একবার দুঃখ প্রকাশ, তারপর সমাধানের কথা, এটাই যথেষ্ট।
নির্দেশনা ৫: যা থাকবে না
শেষে বলুন কী কী বাদ দিতে হবে। এই নির্দেশনাটি সবচেয়ে বেশি সম্পাদনার সময় বাঁচায়।
যা লিখবে না: "আশা করি ভালো আছেন" জাতীয় ভূমিকা, হিসাব বিভাগকে দোষ দেওয়ার মতো কোনো বাক্য, এবং আমি দিইনি এমন কোনো তথ্য বা প্রতিশ্রুতি।
শেষ শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ। AI লেখা গোছাতে গিয়ে নিজে থেকে প্রতিশ্রুতি জুড়ে দিতে পারে, যেমন "ভবিষ্যতে এমন আর হবে না"। আপনি যা বলেননি, তা আপনার নামে চলে যাওয়া ঠিক নয়।
পাঁচটি একসাথে
সব মিলিয়ে প্রম্পটটি দাঁড়ায়:
একটি ইমেইলের খসড়া লেখো।
পাঠক: আমার সরাসরি ব্যবস্থাপক। সম্পর্ক পেশাদার কিন্তু আন্তরিক। তিনি ছোট ইমেইল পছন্দ করেন।
বার্তা: প্রতিবেদনটি বৃহস্পতিবারের বদলে রবিবার জমা দেব। হিসাব বিভাগ থেকে একটি প্রয়োজনীয় তথ্য এখনো আসেনি, শুক্রবারের মধ্যে আসবে। বাকি অংশ তৈরি।
চাওয়া: নতুন তারিখে সম্মতি। বৃহস্পতিবারে কোনো অংশ দরকার হলে তৈরি অংশটুকু আগে পাঠাতে পারি।
সুর ও দৈর্ঘ্য: ভদ্র ও সরাসরি, পাঁচ থেকে ছয় লাইন, বাংলায়।
বাদ: লম্বা ভূমিকা, কাউকে দোষ দেওয়া, আমি দিইনি এমন তথ্য বা প্রতিশ্রুতি। বিষয়ের লাইনের জন্যও একটি প্রস্তাব দাও।
এটি লিখতে দুই মিনিট লাগে। আর যে খসড়া আসে, তাতে সাধারণত দু-একটি শব্দ বদলালেই পাঠানো যায়।
পাঠানোর আগে তিনটি যাচাই
খসড়া যত ভালোই হোক, পাঠানোর বোতাম চাপার আগে তিনটি জিনিস দেখুন:
- তথ্য: তারিখ, দিন, নাম ঠিক আছে তো? AI কখনো বৃহস্পতিবারকে বুধবার লিখে ফেলে।
- প্রতিশ্রুতি: এমন কিছু লেখা আছে কি, যা আপনি বলেননি বা রাখতে পারবেন না?
- সুর: পাঠকের জায়গায় বসে একবার পড়ুন। কোথাও রূঢ় বা অতি বিনয়ী লাগছে?
আর প্রাপকের ঠিকানাটি দেখে নিন। ভুল মানুষের কাছে চলে যাওয়া ইমেইল ফিরিয়ে আনা যায় না।
ইংরেজি ইমেইলের বেলায়
ইংরেজিতে লিখতে হলে একই পাঁচটি নির্দেশনা বাংলায় দিন, শুধু শেষে বলুন "ইংরেজিতে লেখো, সহজ শব্দে।" নিজের ভাষায় ভাবনা গুছিয়ে দিলে ফল ভালো হয়।
খসড়া পাওয়ার পর AI-কে বলুন, "এই ইমেইলের মূল কথা বাংলায় তিন লাইনে বলো।" এতে মিলিয়ে নিতে পারবেন, ইংরেজি লেখাটি আপনি যা বলতে চেয়েছিলেন তা-ই বলছে কি না। যে ইংরেজি শব্দের অর্থ নিশ্চিত জানেন না, সেটি ইমেইলে রাখবেন না।
কখন AI ব্যবহার করবেন না
সব ইমেইলে AI দরকার নেই, আর কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ঠিকও নয়।
- দুই লাইনের সাধারণ উত্তর: নিজে লিখে ফেলাই দ্রুত।
- গোপন তথ্য: কারও বেতন, গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য, চুক্তির বিস্তারিত বা প্রতিষ্ঠানের অপ্রকাশিত সিদ্ধান্ত AI-তে পেস্ট করবেন না। আপনার অফিসে AI ব্যবহারের নিয়ম থাকলে সেটি মেনে চলুন।
- খুব ব্যক্তিগত বার্তা: কারও শোকে সমবেদনা বা আন্তরিক ধন্যবাদ নিজের ভাষায় লিখলেই ভালো শোনায়, দু-একটি ভুল থাকলেও।
অন্যের পাঠানো ইমেইল AI-তে দিয়ে সারাংশ চাইলে নাম ও সংবেদনশীল অংশ মুছে দিন।
একটি ছাঁচ সেভ করে রাখুন
পাঁচটি নির্দেশনার শিরোনাম একটি নোটে লিখে রাখুন: পাঠক, বার্তা, চাওয়া, সুর ও দৈর্ঘ্য, বাদ। পরের বার শুধু ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করবেন।
কয়েকবার ব্যবহারের পর একটি বাড়তি লাভ চোখে পড়বে। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে গিয়ে আপনার নিজের ভাবনাই পরিষ্কার হয়ে যায়। অনেক সময় দেখবেন, ইমেইল লিখতে দেরি হচ্ছিল ভাষার জন্য নয়, আসলে কী চাইছেন তা ঠিক করা ছিল না বলে।
আজই চেষ্টা করুন
- যে ইমেইলটি কয়েক দিন ধরে লিখব লিখব করে ফেলে রেখেছেন, সেটি বেছে নিন।
- পাঁচটি নির্দেশনা পূরণ করে খসড়া নিন।
- তিনটি যাচাই করে নিজের মতো দু-একটি শব্দ বদলে পাঠিয়ে দিন।
ফেলে রাখা ইমেইলটি পাঁচ মিনিটে চলে গেলে বুঝবেন, কঠিন ইমেইল আসলে কঠিন নয়, শুধু গুছিয়ে নেওয়ার ব্যাপার।