AI এখন বাংলায় লিখতে পারে, আর ব্যাকরণেও সাধারণত ভুল করে না। তবু তার লেখা পড়লে একটা অস্বস্তি হয়। বাক্যগুলো ঠিক, কিন্তু মনে হয় ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা। শব্দগুলো ভারী, বাক্যগুলো লম্বা, আর কোথাও যেন মানুষের গলার স্বর নেই।
ভালো খবর হলো, এই সমস্যাগুলো কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায় ঘটে। সেগুলো চিনে গেলে দশ-পনেরো মিনিটের সম্পাদনায় লেখা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এই লেখায় সাতটি কৌশল দেখব, প্রতিটির সাথে আগে ও পরের উদাহরণ।
উদাহরণ: একটি কোচিং সেন্টারের নোটিশ
ধরুন, বরিশালে "আলোর পথ" নামে একটি কাল্পনিক কোচিং সেন্টার অভিভাবকদের জন্য একটি নোটিশ লিখতে AI ব্যবহার করেছে। AI-এর খসড়ার কয়েকটি বাক্য নিয়ে আমরা কাজ করব।
কৌশল ১: ভারী শব্দ বদলে চেনা শব্দ বসান
AI প্রায়ই এমন শব্দ বেছে নেয়, যা অভিধানে আছে কিন্তু মুখে কেউ বলেন না।
আগে:
আমরা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
পরে:
আমরা চাই প্রতিটি শিক্ষার্থী সব দিক থেকে ভালো করুক।
নিয়মটি সহজ: যে শব্দ আপনি অভিভাবকের সাথে সামনাসামনি কথা বলার সময় ব্যবহার করতেন না, সেটি লেখাতেও রাখবেন না। "নিশ্চিতকরণ", "বাস্তবায়ন", "প্রদান করা", "সম্পন্ন করা" জাতীয় শব্দ দেখলেই থামুন। বেশির ভাগ সময় "করা", "দেওয়া", "শেষ করা" দিয়ে কাজ চলে।
কৌশল ২: লম্বা বাক্য ভেঙে দিন
AI একটি বাক্যে তিন-চারটি কথা ঢুকিয়ে দেয়। পাঠক শেষে পৌঁছে শুরুটা ভুলে যান।
আগে:
আগামী মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন ব্যাচে, যেখানে গণিত ও বিজ্ঞানের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে, ভর্তি হতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অফিসে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।
পরে:
আগামী মাসে নতুন ব্যাচ শুরু হচ্ছে। এই ব্যাচে গণিত ও বিজ্ঞানে বেশি জোর দেওয়া হবে। ভর্তি করাতে চাইলে অফিসে যোগাযোগ করুন।
একটি বাক্যে একটি কথা। বাক্য পড়তে গিয়ে যদি মাঝখানে দম নিতে হয়, সেখানেই দাঁড়ি বসান।
কৌশল ৩: "করা হচ্ছে", "করা হবে" কমান
AI-এর বাংলায় কর্মবাচ্যের ছড়াছড়ি। "অনুরোধ করা হচ্ছে", "জানানো যাচ্ছে", "প্রদান করা হবে"। এতে লেখা অফিসের চিঠির মতো শোনায়, আর বোঝা যায় না কাজটি কে করছেন।
আগে:
অভিভাবকদের অবগত করা যাচ্ছে যে মাসিক পরীক্ষার ফলাফল আগামী সপ্তাহে প্রদান করা হবে।
পরে:
মাসিক পরীক্ষার ফল আমরা আগামী সপ্তাহে জানিয়ে দেব।
যেখানে সম্ভব, কে করছেন তা বলুন: "আমরা জানাব", "আপনি আসবেন"। লেখায় সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।
কৌশল ৪: অনুবাদের গন্ধ চিনুন
কিছু বাক্য বাংলা শব্দে লেখা, কিন্তু গঠনটা ইংরেজির। এগুলো চেনার উপায় হলো নিজেকে জিজ্ঞেস করা: বাংলায় কথা বলার সময় কেউ কি এভাবে বলেন?
আগে:
আপনার সন্তানের সাফল্য আমাদের জন্য গুরুত্ব বহন করে।
পরে:
আপনার সন্তান ভালো করুক, এটাই আমরা চাই।
আরও কয়েকটি পরিচিত উদাহরণ: "এটি উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে", "আমরা আশা করি এই বার্তাটি আপনাকে ভালো অবস্থায় পাবে", "দ্বিধা করবেন না"। এগুলো দেখলে পুরো বাক্যটি বাদ দিন অথবা নিজের ভাষায় নতুন করে লিখুন। শব্দ বদলালে হয় না, বাক্যটাই বদলাতে হয়।
কৌশল ৫: ফাঁকা কথা কেটে ফেলুন
AI অনেক বাক্য লেখে, যা শুনতে ভালো কিন্তু কিছু বলে না। সেগুলো কেটে দিলে লেখা ছোট হয় এবং জোর বাড়ে।
আগে:
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই দুই বাক্য থেকে অভিভাবক নতুন কিছু জানলেন না। পুরোটাই বাদ দেওয়া যায়।
পরীক্ষা করার উপায়: বাক্যটি মুছে দিলে পাঠক কি কোনো তথ্য হারাবেন? না হারালে মুছে দিন। লেখার শুরু আর শেষের অনুচ্ছেদে এমন বাক্য সবচেয়ে বেশি থাকে।
কৌশল ৬: ইংরেজি শব্দ নিয়ে একটি নিয়ম ঠিক করুন
AI কখনো সব ইংরেজি শব্দের জোর করে বাংলা করে ফেলে, কখনো অপ্রয়োজনে ইংরেজি বসায়। দুটোই অস্বাভাবিক লাগে।
আগে:
অনলাইন শ্রেণিকক্ষে যুক্ত হওয়ার সংযোগসূত্র মুঠোফোনে ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো হবে।
পরে:
অনলাইন ক্লাসের লিংক আপনার ফোনে এসএমএস করে পাঠাব।
একটি সহজ নিয়ম মেনে চলুন: যে ইংরেজি শব্দ মানুষ মুখে বলেন, সেটি রাখুন, যেমন ক্লাস, লিংক, ফোন, পরীক্ষার রুটিন। যে শব্দের সহজ বাংলা সবাই ব্যবহার করেন, সেখানে বাংলাই লিখুন। আর পুরো লেখায় একই শব্দ এক রকমভাবে লিখুন। এক জায়গায় "ক্লাস", আরেক জায়গায় "শ্রেণি" লিখলে পাঠক বিভ্রান্ত হন।
কৌশল ৭: জোরে পড়ুন
সব কৌশলের মধ্যে এটি সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে কাজের। সম্পাদনা শেষে লেখাটি জোরে পড়ুন, যেন কাউকে শোনাচ্ছেন।
- যেখানে জিভ আটকে যাচ্ছে, সেখানে শব্দ বদলান।
- যেখানে দম ফুরিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাক্য ভাঙুন।
- যেখানে নিজেরই হাসি পাচ্ছে বা অস্বস্তি হচ্ছে, সেই বাক্য নতুন করে লিখুন।
কান অনেক কিছু ধরে, যা চোখ এড়িয়ে যায়।
সম্পাদনার কাজ কমান, আগেই বলে দিয়ে
এই সমস্যাগুলোর অনেকটা প্রম্পটেই আটকানো যায়। AI-কে লিখতে বলার সময় এই নির্দেশগুলো জুড়ে দিন:
সহজ চলিত বাংলায় লেখো, যেভাবে একজন শিক্ষক অভিভাবকের সাথে কথা বলেন। ছোট বাক্য ব্যবহার করো, একটি বাক্যে একটি কথা। "করা হচ্ছে" বা "প্রদান করা হবে" জাতীয় গঠন এড়িয়ে চলো; বরং "আমরা করব" লেখো। ভারী তৎসম শব্দ এবং ভূমিকার ফাঁকা বাক্য বাদ দাও। প্রচলিত ইংরেজি শব্দ, যেমন ক্লাস, লিংক, ফোন, যেমন আছে তেমনই রাখো।
আরও ভালো ফল পাবেন, যদি নিজের লেখা একটি পুরোনো নোটিশ বা পোস্ট দেখিয়ে বলেন, "এই ধরনে লেখো।" নমুনা দেখালে AI আপনার ভাষার কাছাকাছি লেখে।
তবে প্রম্পট যত ভালোই হোক, শেষ পড়াটা আপনাকেই দিতে হবে। AI-এর লেখা সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়ার অভ্যাস করবেন না।
বানান নিয়ে একটি কথা
AI বাংলা বানানে মাঝে মাঝে ভুল করে, বিশেষ করে ই-কার ও ঈ-কার, ণ ও ন, আর যুক্তাক্ষরে। আবার একই শব্দ দুই জায়গায় দুই বানানে লেখে। সন্দেহ হলে একটি নির্ভরযোগ্য অভিধান দেখে নিন। প্রতিষ্ঠানের নাম, মানুষের নাম আর জায়গার নাম নিজে মিলিয়ে নিন, কারণ এসব বানান AI জানে না।
আজই চেষ্টা করুন
- AI দিয়ে লেখা নিজের একটি পুরোনো পোস্ট বা নোটিশ বের করুন।
- সাতটি কৌশল একে একে প্রয়োগ করুন। প্রথমে ভারী শব্দ, তারপর লম্বা বাক্য, এভাবে।
- শেষে জোরে পড়ে আগের লেখার সাথে মিলিয়ে দেখুন।
প্রথমবার সময় একটু বেশি লাগবে। কয়েকবার করার পর চোখ এমন অভ্যস্ত হয়ে যাবে যে AI-এর লেখা পড়তে পড়তেই ধরে ফেলবেন কোন বাক্য বদলাতে হবে।
