ব্যবসা কেমন চলছে, জিজ্ঞেস করলে অনেক মালিক বলেন, "মোটামুটি।" এর বেশি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, কারণ সব তথ্য ছড়িয়ে আছে। বিক্রির হিসাব এক জায়গায়, খরচের হিসাব আরেক জায়গায়, বাকির খাতা আলাদা। মাস শেষে সব মিলিয়ে একটি ছবি দাঁড় করাতে গিয়ে পরের মাসের অর্ধেক পার হয়ে যায়।
ড্যাশবোর্ড এই সমস্যার সমাধান। এটি এক পাতার একটি সারাংশ, যেখানে ব্যবসার সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি সংখ্যা এক নজরে দেখা যায়। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের মতো: গতি, জ্বালানি, ইঞ্জিনের তাপমাত্রা। গাড়িতে শত শত যন্ত্রাংশ আছে, কিন্তু চালকের সামনে থাকে মাত্র কয়েকটি কাঁটা।
ব্যবসার এই জরুরি সংখ্যাগুলোকে বলা হয় KPI, অর্থাৎ যে সূচক দেখে বোঝা যায় কাজ ঠিক পথে এগোচ্ছে কি না। প্রশ্ন হলো, কোন সংখ্যাগুলো রাখবেন?
উদাহরণ: একটি অনলাইন পোশাকের দোকান
ধরুন, "আঁচল" নামে একটি কাল্পনিক অনলাইন দোকান ঢাকা থেকে মেয়েদের পোশাক বিক্রি করে। মালিক প্রতিদিন পেজের লাইক আর পোস্ট কতজন দেখলেন তা দেখেন, আর সেগুলো বাড়লে খুশি হন। কিন্তু মাস শেষে হাতে কত থাকল, তা নিয়ে তাঁর পরিষ্কার ধারণা নেই।
কম সংখ্যা কেন ভালো
প্রথম ড্যাশবোর্ড বানাতে গিয়ে অনেকে বিশ-ত্রিশটি সংখ্যা বসিয়ে দেন। দেখতে খুব পেশাদার লাগে, কিন্তু কেউ তা নিয়মিত দেখেন না। অনেক সংখ্যার মধ্যে জরুরিটি হারিয়ে যায়।
পাঁচটি সংখ্যা মনে রাখা যায়, প্রতি সপ্তাহে দেখা যায় এবং সেগুলো নিয়ে ভাবা যায়। পরে দরকার হলে বাড়াবেন।
ভালো সংখ্যার তিনটি বৈশিষ্ট্য
কোন সংখ্যা ড্যাশবোর্ডে জায়গা পাবে, তা বাছার জন্য তিনটি প্রশ্ন করুন:
- এটি বদলালে আমি কি কিছু করব? যে সংখ্যা দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না, তা শুধু জায়গা দখল করে।
- এটি কি আমি নিয়মিত মাপতে পারব? যে সংখ্যা বের করতে আধা দিন লাগে, তা দুই সপ্তাহ পর আর কেউ বের করেন না।
- এটি কি ব্যবসার আসল স্বাস্থ্য দেখায়? পেজের লাইক দেখতে ভালো লাগে, কিন্তু লাইক দিয়ে বাসা ভাড়া দেওয়া যায় না।
তৃতীয় প্রশ্নটি নিয়ে একটু ভাবুন। কিছু সংখ্যা আছে, যেগুলো বাড়লে ভালো লাগে কিন্তু ব্যবসার সাথে সরাসরি সম্পর্ক কম। এগুলো দেখবেন না, তা নয়। তবে ড্যাশবোর্ডের মূল জায়গায় রাখবেন না।
পাঁচটি সংখ্যা
বেশির ভাগ ছোট ব্যবসার জন্য এই পাঁচটি দিয়ে শুরু করা যায়।
এক, মোট বিক্রি। এই সপ্তাহে বা মাসে কত টাকার পণ্য বিক্রি হলো। সবচেয়ে সহজ সংখ্যা, এবং বাকি সব কিছুর ভিত্তি। আগের সময়ের সাথে তুলনা করে দেখুন বাড়ছে না কমছে।
দুই, মোট লাভ। বিক্রি থেকে পণ্যের কেনা দাম ও সরাসরি খরচ (প্যাকেট, ডেলিভারি, অ্যাড) বাদ দিলে যা থাকে। বিক্রি বাড়লেও লাভ কমতে পারে, যদি ছাড় বেশি দেন বা অ্যাডে বেশি খরচ করেন। তাই বিক্রির পাশে লাভ না দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ।
তিন, অর্ডারের সংখ্যা ও গড় অর্ডারের মূল্য। কয়টি অর্ডার এল, আর প্রতিটি অর্ডারে গড়ে কত টাকার পণ্য। বিক্রি বাড়ানোর দুটি পথ আছে: বেশি অর্ডার আনা, অথবা প্রতি অর্ডারে বেশি বিক্রি করা। এই দুটি সংখ্যা আলাদা করে দেখলে বোঝা যায় কোন পথে কাজ করা দরকার।
চার, ফেরত বা বাতিল হওয়া অর্ডার। কতগুলো অর্ডার ক্রেতা নেননি বা ফেরত দিয়েছেন। অনলাইন ব্যবসায় এটি নীরবে লাভ খেয়ে ফেলে, কারণ প্রতিটি ফেরত অর্ডারে যাওয়া-আসার খরচ আপনার। এই সংখ্যা বাড়লে কারণ খুঁজতে হবে: ছবির সাথে পণ্য মিলছে না, নাকি ডেলিভারিতে দেরি হচ্ছে।
পাঁচ, পুরোনো ক্রেতার অর্ডার। মোট অর্ডারের মধ্যে কতগুলো এমন ক্রেতার, যাঁরা আগেও কিনেছেন। নতুন ক্রেতা আনতে খরচ হয়, পুরোনো ক্রেতা ফিরে এলে সেই খরচ লাগে না। এই সংখ্যাটি বলে দেয় ক্রেতারা আপনার পণ্য ও সেবায় সন্তুষ্ট কি না।
নিজের ব্যবসার সাথে মিলিয়ে নিন
এই পাঁচটি সব ব্যবসায় হুবহু খাটে না। দোকানে বসে বিক্রি করলে ফেরত অর্ডারের বদলে হয়তো বাকির পরিমাণ বেশি জরুরি। সেবার ব্যবসায় হয়তো সময়মতো কাজ শেষ করার হার।
AI-কে দিয়ে নিজের ব্যবসার জন্য তালিকাটি সাজিয়ে নিন:
আমি অনলাইনে মেয়েদের পোশাক বিক্রি করি, অর্ডার নিই ফেসবুক পেজে, ডেলিভারি কুরিয়ারে। আমি একটি সহজ ড্যাশবোর্ড বানাতে চাই, যেখানে পাঁচটির বেশি সংখ্যা থাকবে না। আমার ব্যবসার জন্য কোন পাঁচটি সংখ্যা সবচেয়ে কাজের হবে? প্রতিটির জন্য লেখো: এটি কী, কীভাবে হিসাব করতে হয়, কোন তথ্য লাগবে, এবং এটি বাড়লে বা কমলে আমার কী করা উচিত।
শেষ অংশটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সংখ্যার সাথে একটি কাজ জড়িয়ে না থাকলে সেটি শুধু একটি সংখ্যাই থেকে যায়।
AI-এর প্রস্তাব পরামর্শ হিসেবে নিন। কোন সংখ্যা আপনি সত্যিই নিয়মিত বের করতে পারবেন, তা নিজে বিচার করুন।
ড্যাশবোর্ড বানান একটি শিটে
শুরুতে দামি সফটওয়্যারের দরকার নেই। একটি সাধারণ শিটেই হয়।
- একটি পাতায় কাঁচা তথ্য রাখুন: প্রতিটি অর্ডারের তারিখ, পণ্য, বিক্রির দাম, কেনা দাম, অবস্থা (পৌঁছেছে নাকি ফেরত), নতুন ক্রেতা নাকি পুরোনো।
- আরেকটি পাতায় পাঁচটি সংখ্যা রাখুন, যেগুলো প্রথম পাতা থেকে ফর্মুলা দিয়ে নিজে হিসাব হবে।
- প্রতিটি সংখ্যার পাশে আগের মাসের সংখ্যাটি রাখুন, যাতে তুলনা করা যায়।
ফর্মুলা AI-কে দিয়ে লিখিয়ে নিন। শিটের গঠন বুঝিয়ে বলুন কোন কলামে কী আছে, আর কী হিসাব করতে চান। ফর্মুলা পাওয়ার পর কয়েকটি অর্ডার হাতে গুনে মিলিয়ে নিতে ভুলবেন না।
সাজানোর সময় সহজ রাখুন। প্রতিটি সংখ্যা বড় করে, পাশে ছোট করে আগের মাসের সংখ্যা। একটি বা দুটি চার্ট থাকতে পারে, যেমন সপ্তাহ ধরে বিক্রির রেখা। রং কম ব্যবহার করুন। যে সংখ্যা খারাপ দিকে যাচ্ছে, শুধু সেটি আলাদা রঙে দেখানোই যথেষ্ট।
শিটে ক্রেতার নাম বা ফোন নম্বর থাকলে AI-তে দেওয়ার আগে সেই কলামগুলো বাদ দিন।
দেখার অভ্যাস তৈরি করুন
ড্যাশবোর্ড বানানো সহজ, নিয়মিত দেখা কঠিন। সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন, যেমন শুক্রবার সকালে পনেরো মিনিট। তিনটি প্রশ্ন করুন:
- কোন সংখ্যা গত সপ্তাহের চেয়ে লক্ষণীয়ভাবে বদলেছে?
- কারণ কী হতে পারে?
- এ সপ্তাহে আমি একটি কী কাজ করব?
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর একটি খাতায় লিখে রাখুন। পরের সপ্তাহে দেখবেন সেই কাজে সংখ্যাটি বদলাল কি না। এভাবেই ড্যাশবোর্ড শুধু দেখার জিনিস থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
যা মনে রাখবেন
- একটি সংখ্যা একা কিছু বলে না। বিক্রি কমেছে দেখে ঘাবড়ানোর আগে দেখুন সেই সপ্তাহে ছুটি ছিল কি না। তথ্য থাকলে আগের বছরের একই সময়ের সাথেও তুলনা করুন।
- এক সপ্তাহের ওঠানামায় বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না। কয়েক সপ্তাহ ধরে একই দিকে গেলে তবে সেটি একটি ধারা।
- ভুল তথ্য থেকে ভুল সংখ্যা আসে। অর্ডারের তথ্য নিয়মিত ও ঠিকভাবে না তুললে ড্যাশবোর্ড সুন্দর দেখাবে, কিন্তু মিথ্যা বলবে।
- সংখ্যা কারণ বলে না। ফেরত অর্ডার বেড়েছে, এটি ড্যাশবোর্ড বলবে। কেন বেড়েছে, তা জানতে ক্রেতার সাথে কথা বলতে হবে।
আজই চেষ্টা করুন
- নিজের ব্যবসার জন্য পাঁচটি সংখ্যা লিখুন এবং প্রতিটির পাশে লিখুন, এটি বদলালে আপনি কী করবেন।
- দেখুন প্রতিটি সংখ্যা বের করার তথ্য এখন আপনার কাছে আছে কি না। না থাকলে আজ থেকে সেই তথ্য লিখে রাখা শুরু করুন।
- গত মাসের তথ্য দিয়ে পাঁচটি সংখ্যা একবার হাতে হিসাব করে দেখুন।
হাতে একবার হিসাব করলে বুঝবেন কোন সংখ্যাটি আপনাকে অবাক করছে। সাধারণত সেটিই সেই সংখ্যা, যা এতদিন আপনার চোখের আড়ালে ছিল।
