AI চ্যাট অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলা এত সহজ যে মনে হয় একজন বিশ্বস্ত বন্ধুর সাথে কথা বলছি। সেই স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ অনেক কিছু লিখে ফেলেন: পুরো সিভি, ক্রেতার তালিকা, অফিসের চুক্তিপত্র, এমনকি পাসওয়ার্ডসহ একটি ইমেইল। কাজ হয়ে যায়, আর কেউ ভাবেন না লেখাটি এরপর কোথায় গেল।
AI ব্যবহার করা মানেই ঝুঁকি, তা নয়। কিন্তু চ্যাট বাক্সে যা লিখছেন, তা আপনার ফোনে থেকে যায় না। সেটি ইন্টারনেট দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটারে যায়। তাই কী লিখবেন আর কী লিখবেন না, তার কয়েকটি সহজ নিয়ম জানা থাকলে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়।
আপনার লেখা কোথায় যায়
আপনি যখন AI-কে কিছু লেখেন, সাধারণত এই ঘটনাগুলো ঘটে:
- লেখাটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে যায়, সেখানে প্রক্রিয়া হয়ে উত্তর তৈরি হয়।
- কথোপকথনটি আপনার অ্যাকাউন্টের ইতিহাসে জমা থাকে, যাতে পরে দেখতে পারেন।
- সেবার ধরন ও সেটিংস অনুযায়ী, আপনার লেখা সেবাটি উন্নত করার কাজে ব্যবহার হতে পারে, এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মান যাচাইয়ের জন্য কথোপকথন দেখতে পারেন।
ঠিক কী হয়, তা প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা এবং সময়ের সাথে বদলায়। তাই যে অ্যাপ ব্যবহার করছেন, তার গোপনীয়তা নীতি ও সেটিংস নিজে একবার দেখে নিন। অনেক অ্যাপে এমন সেটিং থাকে, যা দিয়ে নিজের কথোপকথন প্রশিক্ষণে ব্যবহার বন্ধ করা যায় বা ইতিহাস মুছে ফেলা যায়।
তবে একটি সহজ নীতি সব ক্ষেত্রে খাটে: যা আপনি একটি পোস্টকার্ডে লিখে ডাকে পাঠাতেন না, তা AI-তেও লিখবেন না।
উদাহরণ: একটি ছোট অফিসের ঘটনা
ধরুন, বরিশালের একটি কাল্পনিক ট্রাভেল এজেন্সিতে নাদিয়া নামে একজন কর্মী কাজ করেন। একজন গ্রাহকের জন্য ভিসার আবেদনের সাথে একটি চিঠি লিখতে হবে। সময় বাঁচাতে তিনি গ্রাহকের পাসপোর্টের তথ্য, জন্মতারিখ, ঠিকানা আর ব্যাংক হিসাবের বিবরণ সবই AI-তে পেস্ট করে বললেন, "এগুলো দিয়ে একটি চিঠি লেখো।"
চিঠিটি ভালো হলো। কিন্তু নাদিয়া একজন মানুষের সবচেয়ে সংবেদনশীল তথ্য তাঁর অনুমতি ছাড়া একটি তৃতীয় পক্ষের কাছে পাঠিয়ে দিলেন। অথচ চিঠি লেখার জন্য এসব তথ্যের কোনোটিই AI-এর দরকার ছিল না। কীভাবে একই কাজ নিরাপদে করা যেত, তা একটু পরে দেখব।
যে পাঁচ ধরনের তথ্য দেবেন না
এক, পরিচয় ও আর্থিক তথ্য। জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টের নম্বর, জন্মনিবন্ধনের তথ্য, ব্যাংক হিসাব বা কার্ডের নম্বর, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পিন। এগুলো দিয়ে আপনার নামে প্রতারণা করা সম্ভব।
দুই, পাসওয়ার্ড ও গোপন কোড। কোনো পাসওয়ার্ড, ফোনে আসা এককালীন কোড, বা কোনো অ্যাকাউন্টের গোপন প্রশ্নের উত্তর। কোনো অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ঠিক করতে সাহায্য চাইলেও পাসওয়ার্ড দেওয়ার দরকার হয় না।
তিন, অন্য মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য। ক্রেতা, রোগী, শিক্ষার্থী, কর্মী বা পরিচিত কারও নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর, স্বাস্থ্যের তথ্য, বেতন বা পারিবারিক বিষয়। তাঁরা আপনাকে তথ্য দিয়েছিলেন একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য, AI-তে দেওয়ার জন্য নয়।
চার, প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য। প্রকাশ না হওয়া পরিকল্পনা, চুক্তির শর্ত, দরপত্রের হিসাব, গ্রাহকের তালিকা, ভেতরের আর্থিক প্রতিবেদন। আপনার অফিসে AI ব্যবহারের নিয়ম থাকলে সেটি আগে জেনে নিন।
পাঁচ, খুব ব্যক্তিগত বিষয়। নিজের বা পরিবারের স্বাস্থ্যের বিস্তারিত, আইনি ঝামেলা, বা এমন কিছু যা ফাঁস হলে বিব্রত হবেন বা ক্ষতি হবে। পরামর্শ চাইতে পারেন, তবে নাম-পরিচয় ছাড়া, সাধারণভাবে।
তথ্য আড়াল করেও কাজ হয়
ভালো খবর হলো, বেশির ভাগ কাজে আসল তথ্যের দরকারই পড়ে না। AI-এর দরকার কাজের গঠন, মানুষের পরিচয় নয়। তিনটি কৌশল মনে রাখুন।
কৌশল ১: নামের জায়গায় ফাঁকা ঘর। আসল তথ্যের জায়গায় বন্ধনীতে একটি নাম বসান। নাদিয়া লিখতে পারতেন:
একজন গ্রাহকের ভিসা আবেদনের সাথে দেওয়ার জন্য ট্রাভেল এজেন্সির পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠির খসড়া লেখো। চিঠিতে থাকবে: গ্রাহক আমাদের মাধ্যমে ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছেন, ভ্রমণের তারিখ, এবং ফেরার টিকিট নিশ্চিত আছে। পরিবর্তনশীল তথ্যের জায়গায় তৃতীয় বন্ধনী ব্যবহার করো, যেমন [গ্রাহকের নাম], [পাসপোর্ট নম্বর], [ভ্রমণের তারিখ]।
চিঠি পাওয়ার পর তিনি নিজের কম্পিউটারে ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ করতেন। ফল একই, কিন্তু গ্রাহকের কোনো তথ্য বাইরে গেল না।
কৌশল ২: সাধারণ করে বলুন। "আমার ক্রেতা রহিম সাহেব, বাসা অমুক রোডে, গত মাসে অমুক পণ্য কিনে অভিযোগ করেছেন" না লিখে বলুন, "একজন ক্রেতা একটি পণ্য কিনে এই অভিযোগ করেছেন।" উত্তর লেখার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
কৌশল ৩: বানানো উদাহরণ ব্যবহার করুন। শিটের ফর্মুলা বা তালিকা সাজানোর জন্য সাহায্য চাইলে আসল তথ্যের বদলে একই গঠনের বানানো তথ্য দিন: "ক্রেতা ক", "ক্রেতা খ", এলোমেলো সংখ্যা। ফর্মুলা আসল শিটেও একইভাবে কাজ করবে।
ফাইল ও ছবিতে সাবধান
এখন অনেক AI অ্যাপে ফাইল ও ছবি দেওয়া যায়। এখানে ভুল বেশি হয়, কারণ ফাইলের ভেতরে কী আছে তা সব সময় খেয়াল থাকে না।
- পুরো নথি দেওয়ার আগে দেখুন ভেতরে কারও নাম, নম্বর, স্বাক্ষর বা হিসাব আছে কি না। দরকার হলে সেই অংশ মুছে একটি কপি বানিয়ে দিন।
- স্ক্রিনশটে প্রায়ই অন্য মানুষের মেসেজ, নম্বর বা নোটিফিকেশন চলে আসে। দেওয়ার আগে কেটে নিন।
- ছবিতে পরিচয়পত্র, প্রেসক্রিপশন, চেক বা অন্য মানুষের মুখ থাকলে দেবেন না।
- শিটে যে কলামগুলো কাজের জন্য লাগবে না, সেগুলো বাদ দিয়ে দিন।
অ্যাপ বাছাই ও অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা
কোন অ্যাপে লিখছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
- পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত সেবা ব্যবহার করুন। অচেনা অ্যাপ বা ওয়েবসাইট, যা নিজেকে জনপ্রিয় কোনো AI-এর নামে পরিচয় দেয়, তা এড়িয়ে চলুন। অ্যাপ নামানোর সময় প্রকাশকের নাম মিলিয়ে নিন।
- শক্ত পাসওয়ার্ড দিন এবং সম্ভব হলে দুই ধাপের যাচাই চালু রাখুন। আপনার অ্যাকাউন্টে কেউ ঢুকলে পুরো কথোপকথনের ইতিহাস দেখতে পাবে।
- অন্যের ফোন বা সাইবার ক্যাফের কম্পিউটারে ব্যবহারের পর অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে আসুন।
- ব্রাউজারের এক্সটেনশন যেগুলো "AI সহকারী" বলে দাবি করে, সেগুলো আপনার খোলা সব পাতা পড়তে পারে। না বুঝে বসাবেন না।
প্রতারণা থেকে সাবধান
AI জনপ্রিয় হওয়ায় প্রতারকরাও এর সুযোগ নিচ্ছে। কয়েকটি বিষয় মনে রাখুন:
- কোনো আসল AI সেবা আপনার কাছে ফোনে আসা কোড, পিন বা পাসওয়ার্ড চাইবে না।
- পরিচিত মানুষের কণ্ঠ বা লেখার ধরন নকল করে টাকা চাওয়া এখন সহজ হয়েছে। জরুরি বলে টাকা চাইলে অন্য একটি উপায়ে, যেমন সরাসরি ফোন করে, নিশ্চিত হয়ে নিন।
- "AI দিয়ে সহজে আয়" জাতীয় প্রস্তাবে আগাম টাকা বা ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে সেটি সন্দেহজনক।
ভুল করে দিয়ে ফেললে
কখনো ভুল হতেই পারে। তখন:
- সেই কথোপকথনটি ইতিহাস থেকে মুছে দিন।
- পাসওয়ার্ড বা কোড দিয়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি বদলে ফেলুন।
- ব্যাংক বা কার্ডের তথ্য হলে ব্যাংককে জানান।
- প্রতিষ্ঠানের বা অন্য কারও তথ্য হলে দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে জানান। লুকিয়ে রাখলে ক্ষতি বাড়ে।
লেখার আগে তিন সেকেন্ডের প্রশ্ন
প্রতিবার কিছু পেস্ট করার আগে নিজেকে তিনটি প্রশ্ন করুন:
- এখানে কি এমন কিছু আছে, যা দিয়ে কোনো মানুষকে চেনা যায় বা তার ক্ষতি করা যায়?
- এই তথ্য কি আমার নিজের, নাকি অন্য কেউ আমাকে বিশ্বাস করে দিয়েছেন?
- এটি ছাড়াই কি কাজটি করানো সম্ভব?
তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর প্রায় সব সময়ই "হ্যাঁ"।
আজই চেষ্টা করুন
- যে AI অ্যাপটি ব্যবহার করেন, তার সেটিংসে গিয়ে গোপনীয়তার অংশটি একবার দেখুন।
- পুরোনো কথোপকথনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখুন কোথাও সংবেদনশীল কিছু দিয়ে ফেলেছেন কি না। থাকলে মুছে দিন।
- পরের কাজে নামের জায়গায় ফাঁকা ঘর বসিয়ে প্রম্পট লিখুন এবং দেখুন ফল একই আসে কি না।
গোপনীয়তা রক্ষা করা মানে AI থেকে দূরে থাকা নয়। এর মানে হলো ভেবে ব্যবহার করা। এই কয়েকটি অভ্যাস গড়ে নিলে AI-এর সুবিধা পুরোটাই পাবেন, নিজের আর অন্যের তথ্য ঝুঁকিতে না ফেলে।

