আপনি AI-কে লিখলেন, "একটা ফেসবুক পোস্ট লিখে দাও।" কয়েক সেকেন্ডে উত্তর এল। পড়ে দেখলেন, লেখাটা ভুল নয়, কিন্তু এমন লেখা যেকোনো দোকানের পেজে বসিয়ে দেওয়া যায়। আপনার দোকানের কথা, আপনার ক্রেতার কথা, এই সপ্তাহের অফারের কথা কিছুই নেই।
এখানে AI-এর দোষ কম। আপনি যতটুকু বলেছেন, সে ততটুকুই জানে। ভালো উত্তর পেতে হলে প্রশ্নটা গুছিয়ে করতে হয়। এই গুছিয়ে লেখা প্রশ্নকেই বলা হয় প্রম্পট।
ভালো প্রম্পট লেখার জন্য বড় কোনো কৌশল লাগে না। চারটি অংশ মনে রাখলেই চলে: ভূমিকা, কাজ, প্রেক্ষাপট এবং ফরম্যাট। এই লেখায় একটি উদাহরণ ধরে চারটি অংশই দেখব।
উদাহরণ: একটি ছোট অনলাইন দোকান
ধরুন, মিরপুরে "রুপালি বুটিক" নামে একটি কাল্পনিক অনলাইন দোকান আছে। তারা হাতের কাজের থ্রি-পিস বিক্রি করে, ফেসবুক পেজ থেকে অর্ডার নেয়। সামনে ঈদ, নতুন কালেকশন এসেছে। দোকানের মালিক একটি পোস্ট লিখতে চান।
শুরুতে তিনি যা লিখেছিলেন:
নতুন কালেকশনের জন্য একটা ফেসবুক পোস্ট লিখে দাও।
এই এক লাইনকে আমরা ধাপে ধাপে ভালো প্রম্পটে বদলাব।
অংশ ১: ভূমিকা — AI কার মতো ভাববে
প্রথমে AI-কে বলে দিন সে কোন ভূমিকায় কাজ করবে। একজন আইনজীবী আর একজন দোকানের কর্মচারী একই প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে দেন। AI-এর বেলাতেও তাই।
যেমন:
তুমি একজন অভিজ্ঞ সোশ্যাল মিডিয়া লেখক, যে বাংলাদেশের ছোট অনলাইন দোকানের জন্য ফেসবুক পোস্ট লেখে।
ভূমিকা বলে দিলে AI শব্দ বাছাই, লেখার ধরন আর উদাহরণ সেই অনুযায়ী ঠিক করে। ভূমিকা লম্বা হওয়ার দরকার নেই। এক লাইনই যথেষ্ট।
অংশ ২: কাজ — ঠিক কী চাই
এবার পরিষ্কার করে বলুন কী করতে হবে। "পোস্ট লিখে দাও" বললে AI অনুমান করে নেয় পোস্টটা কত বড় হবে, কয়টা লাগবে, উদ্দেশ্য কী। অনুমান যত বেশি, উত্তর তত এলোমেলো।
কাজ লেখার সময় তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিন:
- কী বানাতে হবে? (একটি ফেসবুক পোস্ট)
- কয়টি? (তিনটি ভিন্ন সংস্করণ, যাতে বেছে নেওয়া যায়)
- উদ্দেশ্য কী? (ক্রেতা যেন ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে অর্ডার করেন)
যেমন:
ঈদের নতুন কালেকশন নিয়ে তিনটি আলাদা ফেসবুক পোস্ট লেখো। প্রতিটির উদ্দেশ্য: পাঠক যেন ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে অর্ডার করেন।
একটি প্রম্পটে একটিই কাজ রাখুন। পোস্ট, ব্যানারের লেখা আর ইনবক্সের উত্তর একসাথে চাইলে কোনোটিই ভালো হয় না। আলাদা আলাদা করে চান।
অংশ ৩: প্রেক্ষাপট — যা না বললে AI জানবে না
এই অংশটিই সবচেয়ে বেশি মানুষ বাদ দেন, আর এখানেই উত্তরের মান সবচেয়ে বেশি বদলায়। আপনার ব্যবসা, আপনার ক্রেতা, আপনার অফার সম্পর্কে AI কিছুই জানে না। আপনি না বললে সে বানিয়ে নেবে।
প্রেক্ষাপটে সাধারণত এগুলো দিন:
- ব্যবসা: কী বিক্রি করেন, কোথায়, কীভাবে অর্ডার নেন
- ক্রেতা: কারা কেনেন, তাঁদের কী নিয়ে চিন্তা থাকে
- এই মুহূর্তের তথ্য: নতুন কী এসেছে, অফার আছে কি না, কবে পর্যন্ত
- লেখার ধরন: বন্ধুর মতো সহজ, নাকি আনুষ্ঠানিক
- যা চাই না: কোন কথা লেখা যাবে না
যেমন:
দোকানের নাম রুপালি বুটিক, মিরপুর থেকে পরিচালিত অনলাইন দোকান। আমরা হাতের কাজের থ্রি-পিস বিক্রি করি। ক্রেতারা মূলত ২০ থেকে ৩৫ বছরের কর্মজীবী নারী, যাঁরা ঈদের আগে মার্কেটে যাওয়ার সময় পান না। নতুন কালেকশনে ১২টি ডিজাইন এসেছে। ঢাকার ভেতরে ডেলিভারি দুই দিনে, ক্যাশ অন ডেলিভারি আছে। লেখার ধরন হবে সহজ ও আন্তরিক। "সেরা", "এক নম্বর" জাতীয় অতিরঞ্জিত দাবি লিখবে না।
লক্ষ করুন, শেষ লাইনে বলে দেওয়া হয়েছে কী লেখা যাবে না। এটুকু বলে দিলে পরে অনেক সম্পাদনার কষ্ট বাঁচে।
একটি সতর্কতা: প্রেক্ষাপটে ক্রেতার নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা বা অন্য কারও ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না। ব্যবসার সাধারণ বর্ণনাই যথেষ্ট।
অংশ ৪: ফরম্যাট — উত্তর দেখতে কেমন হবে
শেষে বলুন উত্তরটি কোন আকারে চান। না বললে AI কখনো লম্বা অনুচ্ছেদ দেয়, কখনো তালিকা, কখনো অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা জুড়ে দেয়।
ফরম্যাটে বলতে পারেন:
- দৈর্ঘ্য: কত শব্দ বা কত লাইন
- গঠন: অনুচ্ছেদ, তালিকা, নাকি টেবিল
- ভাষা: বাংলা, ইংরেজি, নাকি মেশানো
- বিশেষ কিছু: ইমোজি থাকবে কি না, শেষে কী লেখা থাকবে
যেমন:
প্রতিটি পোস্ট ৬০ থেকে ৮০ শব্দের মধ্যে, সহজ বাংলায়। প্রথম লাইন এমন হবে যেন পাঠক থেমে পড়েন। শেষ লাইনে থাকবে "অর্ডার করতে ইনবক্স করুন"। প্রতিটি পোস্টে দুটির বেশি ইমোজি নয়। পোস্টগুলো ১, ২, ৩ নম্বর দিয়ে আলাদা করো।
চার অংশ একসাথে
এবার সব জোড়া লাগালে প্রম্পটটি দাঁড়ায় এমন:
তুমি একজন অভিজ্ঞ সোশ্যাল মিডিয়া লেখক, যে বাংলাদেশের ছোট অনলাইন দোকানের জন্য ফেসবুক পোস্ট লেখে।
ঈদের নতুন কালেকশন নিয়ে তিনটি আলাদা ফেসবুক পোস্ট লেখো। প্রতিটির উদ্দেশ্য: পাঠক যেন ইনবক্সে মেসেজ দিয়ে অর্ডার করেন।
দোকানের নাম রুপালি বুটিক, মিরপুর থেকে পরিচালিত অনলাইন দোকান। আমরা হাতের কাজের থ্রি-পিস বিক্রি করি। ক্রেতারা মূলত ২০ থেকে ৩৫ বছরের কর্মজীবী নারী, যাঁরা ঈদের আগে মার্কেটে যাওয়ার সময় পান না। নতুন কালেকশনে ১২টি ডিজাইন এসেছে। ঢাকার ভেতরে ডেলিভারি দুই দিনে, ক্যাশ অন ডেলিভারি আছে। লেখার ধরন হবে সহজ ও আন্তরিক। অতিরঞ্জিত দাবি লিখবে না।
প্রতিটি পোস্ট ৬০ থেকে ৮০ শব্দের মধ্যে, সহজ বাংলায়। শেষ লাইনে থাকবে "অর্ডার করতে ইনবক্স করুন"। প্রতিটি পোস্টে দুটির বেশি ইমোজি নয়। পোস্টগুলো ১, ২, ৩ নম্বর দিয়ে আলাদা করো।
প্রথম এক লাইনের প্রম্পটের সাথে এটি মিলিয়ে দেখুন। লিখতে হয়তো দুই মিনিট বেশি লাগল। কিন্তু এবার যে উত্তর আসবে, তাতে আপনার দোকানের কথা থাকবে, আপনার ক্রেতার কথা থাকবে, আর সেটি প্রায় সরাসরি ব্যবহার করা যাবে।
প্রথম উত্তরই শেষ উত্তর নয়
ভালো প্রম্পট লিখলেও প্রথম উত্তর সব সময় মনের মতো হয় না। তখন নতুন করে শুরু না করে একই কথোপকথনে ঠিক করে নিন। যেমন:
- "২ নম্বর পোস্টটি ভালো লেগেছে। এটিকে আরও ছোট করো।"
- "প্রথম লাইনগুলো খুব সাধারণ। ঈদের কেনাকাটার ভিড়ের কথা দিয়ে শুরু করো।"
- "ভাষাটা একটু বেশি আনুষ্ঠানিক হয়ে গেছে। বন্ধুকে বলার মতো করে লেখো।"
কী ভালো লাগেনি তা যত নির্দিষ্ট করে বলবেন, পরের উত্তর তত কাছাকাছি আসবে। "ভালো হয়নি, আবার লেখো" বললে AI আবার অনুমানই করবে।
প্রকাশের আগে নিজে পড়ুন
AI লেখা সাজিয়ে দিতে পারে, কিন্তু আপনার ব্যবসার তথ্য যাচাই করার দায়িত্ব আপনার। পোস্ট করার আগে তিনটি জিনিস মিলিয়ে নিন:
- তথ্য ঠিক আছে তো? দাম, ডিজাইনের সংখ্যা, ডেলিভারির সময় আপনি যা বলেছেন তা-ই আছে, নাকি AI নিজে থেকে কিছু যোগ করেছে।
- এমন কোনো প্রতিশ্রুতি আছে কি, যা আপনি রাখতে পারবেন না? যেমন "সারা দেশে এক দিনে ডেলিভারি"।
- লেখাটা আপনার মতো শোনাচ্ছে তো? দরকার হলে দু-একটি শব্দ নিজের মতো বদলে নিন।
আজই চেষ্টা করুন
নিজের কাজের একটি ছোট লেখা বেছে নিন। হতে পারে একটি পোস্ট, একটি ইমেইল বা একটি নোটিশ। তারপর:
- আগে এক লাইনের প্রম্পট দিয়ে উত্তর নিন।
- এবার ভূমিকা, কাজ, প্রেক্ষাপট ও ফরম্যাট লিখে আবার চান।
- দুটি উত্তর পাশাপাশি রেখে দেখুন কোনটি বেশি কাজে লাগছে।
পার্থক্যটা নিজের চোখে একবার দেখলে চারটি অংশ আর মুখস্থ করতে হবে না। পরেরবার প্রম্পট লিখতে বসলে নিজে থেকেই মনে পড়বে: কে লিখবে, কী লিখবে, কার জন্য, আর দেখতে কেমন হবে।